টাঙ্গুয়ার হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যা সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় বিস্তৃত। এটি শুধু একটি জলাভূমি নয়, বরং প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়, যেখানে বর্ষায় জলরাশি, শীতে পাখির মেলা, নীল জলরাশির প্রতিফলন, সবুজ টিলা আর সোনালি সূর্যাস্ত মিলে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।
বর্ষার অপরূপ দৃশ্যঃ
অসীম জলরাশি ও নীল আকাশের মেলবন্ধন। বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর এক বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, যেখানে দিগন্তজোড়া নীল জল ও আকাশ একসঙ্গে মিশে যায়। তখন এখানে বড় বড় গাছের মাথা আর কিছু উঁচু স্থান ছাড়া সবকিছু পানির নিচে চলে যায়, যা এক আশ্চর্য সৌন্দর্য তৈরি করে। ছোট ছোট নৌকায় ভ্রমণ করলে মনে হয়, আপনি কোনো বিশাল হ্রদের মাঝে আছেন, যেখানে কেবল বাতাসের ছোঁয়ায় ঢেউয়ের মৃদু নাচন।

মেঘের খেলা ও বৃষ্টির ছোঁয়াঃ
বর্ষার সময় আকাশে ভাসমান সাদা-কালো মেঘের খেলা টাঙ্গুয়ার হাওরকে আরও মোহময় করে তোলে। হঠাৎ করে কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেলে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়, আর সেই বৃষ্টির ফোঁটা যখন স্বচ্ছ জলের ওপর পড়ে, তখন সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

যাদুকাটা নদীর রূপঃ
টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশেই বয়ে চলেছে যাদুকাটা নদী, যার নীল জল আর স্বচ্ছ পাথরের সমাহার এক ভিন্ন মাত্রার সৌন্দর্য এনে দেয়। বিশেষ করে বর্ষায় যখন পাহাড় থেকে স্বচ্ছ পানি নেমে আসে, তখন নদীর সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে যায়।

শীতের সময় পাখির রাজ্যঃ
পরিযায়ী পাখিদের মিলনমেলা। শীতকাল মানেই টাঙ্গুয়ার হাওরে হাজার হাজার পাখির আনাগোনা। সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, তিব্বত ও হিমালয়ের এলাকা থেকে পরিযায়ী পাখিরা এখানে আসে, যা এক অপূর্ব দৃশ্যের জন্ম দেয়। এখানে দেখা যায়—

বালিহাঁস,সরালি হাঁস, চখাচখি, পাতারি হাঁস, বক, মাছরাঙা, বিভিন্ন প্রজাতির পানকৌড়ি শীতকালে হাওরের নির্জন জলাভূমি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত অভয়ারণ্য, যেখানে সারাদিন পাখিদের কলকাকলি আর উড়াউড়ি এক স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি করে।
নীলাদ্রি লেকের স্বচ্ছ নীল জলঃ
টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হলো নীলাদ্রি লেক, যা শহীদ সিরাজ লেক নামেও পরিচিত। এটি আসলে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ঘেঁষা একটি জলাশয়, যার পানির রঙ এতটাই স্বচ্ছ ও নীল যে দূর থেকে মনে হবে, এটি কোনো বড়সড় কাঁচের আয়না! বিশেষ করে বিকেলে যখন সূর্যের আলো পানির ওপর পড়ে, তখন এটি সোনালি আভায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

বারিক্কা টিলার সৌন্দর্যঃ
বারিক্কা টিলা থেকে পুরো হাওরের দৃশ্য। বারিক্কা টিলা হলো একটি উঁচু পাহাড়ি টিলা, যেখান থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি একনজরে দেখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচের স্বচ্ছ জলরাশি ও সূর্যের প্রতিফলন দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে এক অসাধারণ চিত্রকর্ম তৈরি করেছে।

শিমুল বাগানের লাল সৌন্দর্যঃ
ফাল্গুন মাসে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) শিমুল বাগান টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্যে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। শত শত লাল শিমুল ফুলের গাছ যখন একসঙ্গে ফোটে, তখন পুরো এলাকা যেন এক লাল গালিচার মতো মনে হয়।

গোধূলি ও রাতের মায়াময় পরিবেশঃ
গোধূলি ও রাতের মায়াময় পরিবেশ। সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য। গোধূলি বেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের পানির ওপর সূর্যের রঙ পরিবর্তনের খেলা এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য তৈরি করে। যখন সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের কোণে হারিয়ে যায়, তখন জলরাশি কমলা ও সোনালি আলোয় ঝলমল করে ওঠে।

নৌকায় রাতের যাত্রাঃ
যদি কেউ রাতে নৌকায় থাকেন, তাহলে দেখবেন আকাশভর্তি তারা আর হালকা বাতাসের সঙ্গে ঢেউয়ের শব্দ—এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে। তখন মনে হবে, যেন প্রকৃতির একান্ত কোলে শুয়ে আছেন।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি প্রকৃতির এক স্বপ্নময় রূপ, যেখানে গেলে মনের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আপনি যদি প্রকৃতিপ্রেমী হন, তাহলে একবার হলেও এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে এখানে আসতে হবে।
5,000 tk
2 Days - 3 Nights